Sunday, August 7, 2016

টেঁপি


দু’পাশে দু’টো উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি- মুখোমুখি দু’টো জানালা, দু’টো ব্যালকনি। একদিকের ফ্ল্যাটে কেউ থাকেনা, অন্যদিকে দুই বুড়োবুড়ি সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকে। আমি আর টেঁপি প্রতিদিন এই দুই বাড়ির মাঝের ফাঁকা জায়গায় এসে বসি। বেশ ছিলো, এই গতমাসে সামনের ফাঁকা ফ্ল্যাটটায় প্রথম হৈ-হট্টগোল শোনা গেলো। জোর আওয়াজ- অনেক লোক, অনেক জিনিসপত্র বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকলো- বাড়িতে নতুন ভাড়াটে এসেছে। স্বামী-স্ত্রী, দুইজন। কমবয়স, সদ্য বিয়ে হয়েছে বোঝা যায়। দিন তিনেকের মধ্যেই সাজিয়ে গুছিয়ে ফেললো সংসার। দেখলাম, ওদের মধ্যে খুব ভাব। এর বেশি আর আমরা লক্ষ্য করিনি।
মাঝে মধ্যে বউটা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়, আমাদের দিকে তাকায়- ইতিউতিও চায়। আমরা ওকে বিশেষ পাত্তা দিইনা। বউটা সারাদিন একলা থাকে। বর সকাল সকাল অফিস যায়, সন্ধ্যে হলে ফেরে। সন্ধ্যের পর যেহেতু আমি আর টেঁপি ওই তল্লাটে বিশেষ থাকিনা, তাই তারপর কি হয়, আমাদের আর জানা হয় না।

আজ সকালে খুব গোলমালের আওয়াজ শোনা গেলো ওই বাড়ি থেকে। চীৎকার-চেঁচামেচি, নারীকন্ঠে কান্নার শব্দ, পুরুষকন্ঠে চাপা হুমকি। ছেলেটা যেন একটু তাড়াতাড়িই অফিসে বেরিয়ে গেলো। আমরা নিজেদের কাজে মন দিলাম। মেয়েটা সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা দিন উদাস হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ব্যালকনিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। অঝোরে কাঁদছিলোও মনে হয়। আমি দেখিনি, টেঁপি দেখালো। তারপর যা হয়, কান্না একসময় থেমেও গেলো।
বিকেল হওয়ার একটু আগে চোখ মুছে ফেলে ভেতরে চলে গেলো মেয়েটা। একটু পরে দরজার শব্দ- তারপর আমাদের সামনে দিয়েই রাস্তা দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলো। আমরা অপেক্ষা করলাম। সূর্য ডোবার পরে টেঁপি আর ওখানে থাকতে চায় না বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় যেতে হলো।
পরদিন একটু তাড়াতাড়িই এসে বসলাম আমাদের জায়গায়। ছেলেটা আজ অফিস যায়নি। মেয়েটাও এখনো ফেরেনি। বদলে আজ ছেলেটাই এসে দাঁড়িয়ে আছে ওই ব্যালকনিতে। সিগারেট খাচ্ছে। মাঝে মধ্যে একে তাকে ফোন করছে আর এসব যখন করছে না, তখন মাথা চেপে দাঁড়িয়ে থাকছে রেলিং ধরে। বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন মাথা তুললো, লাল চোখ সোজা পড়লো আমার চোখে। আমি তক্কে তক্কেই ছিলাম। টেঁপির মাথাটা একটু চুলকে দিলাম আদর করে। টেঁপি বাদাম খাচ্ছিলো একমনে। চমকে আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। তাই আবার নিশ্চিন্তে খাওয়ায় মন দিলো।
এদিকে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ছেলেটা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে জামা-কাপড় পরে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।

মেয়েটা যখন বাড়ি ফিরলো, তখন মাঝদুপুর পেরিয়ে গেছে। নাঃ, মেয়েটা একাই ফিরলো, ছেলেটা ফেরেনি। বেশ কিছুক্ষণ ঘরে খুটখাট করে অবশেষে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। আমাদের এখনো দেখতে পায়নি। ওর সমস্ত মন রাস্তার দিকে পড়ে আছে।
ছেলেটা বাড়ি ফিরলো যখন, তখনো মেয়েটা ব্যালকনিতে। একটা মোড়ায় বসে রেলিঙে মাথা রেখেছিলো। তাই একে অন্যকে দেখতে পায়নি। ঘরের দরজায় বোধহয় ইয়েল লক লাগানো, কারণ ছেলেটা এসে বেল না বাজিয়ে ঢুকতে পেরেছিলো। যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, আমি একবার টেঁপির দিকে তাকিয়ে দেখি, ও ঘাড় সোজা করে রুদ্ধশ্বাসে ওদের দেখছে।
ঠিক যেভাবে ঝগড়ার পরে আমি আর টেঁপি ভাব করি, সেভাবেই ওরা ভাব করলো। একটু বেশিই কাঁদলো। তা সে নতুন বিয়ে হয়েছে, হতেই পারে। ঘন্টাখানেক পরে ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো বারান্দায়।
কিছুক্ষণ পরে, আজকে প্রথম, আমাদের দিকে নজর পড়লো ওর। বরকে বললো, “দেখো, ওই চড়ুই দুটো না, বর-বউ... আমাদের মতো।” বরটা আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু নামিয়ে হেসে বললো, “জানি”।

সূর্য ডুবছিলো, তাই সেদিনের মতো আমরা উড়ে পালালাম।

No comments:

Post a Comment

Give me your thoughts, I will give you replies. :P