Tuesday, November 6, 2018
Wednesday, June 29, 2016
চাকা
মহাকাল সবে দু’পাত্তর চড়িয়ে কোয়ান্টাম কাব্যে মনোনিবেশ করে
মনের এককোনায় কথা আর সুরের মধ্যে কাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায় সেই নিয়ে ভাবতে
বসেছিলেন, এমন সময়ে অনুপমের নতুন গানে “...আমার সব ঠাকুরেই ভক্তি...” পংক্তিটা
শুনে বিষম টিষম খেয়ে একেবারে একাকার অবস্থা। সামলে উঠে গানটা মন দিয়ে শোনার আগেই
খেয়াল পড়লো – এই অসময়ের অন্যমনস্কতায় তিনটে গ্যালাক্সি ধ্বসে গেছে। মহাকালের পোষা
বেড়ালটা বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে “ব্যানার্জি সিনড্রোম” বলে খ্যাক্ খ্যাক্ করে
হাসতে হাসতে পাশের ঘরে চলে গেলো। মহাকাল ওকে বিশেষ গুরুত্ব দিলেন না। যে অবসর সময়ে
দাঁতগুলো রেখে দিয়ে অদৃশ্য হয়ে যায়, আর যার ঘন্টায় ঘন্টায় রুমাল হয়ে যেতে ইচ্ছে
করে, তাকে আমল দিতে মহাকালের বয়েই গেছে। হাতের গ্লাসটার দিকে সন্দিগ্ধ চোখে
কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে ওটাকে টেবিলে রেখে সদ্য শেষ করা বইয়ের “Death is lighter than a feather,
duty is heavier than a mountain.” ডায়লগটা
আউড়ে বেশ খানিক আত্মশ্লাঘা বোধ করে আবার কাব্যে মন দিলেন। মহাকালের এই সাময়িক
বিচ্যুতির সুযোগে লিপযিগ গ্যালাক্সির ষষ্ঠ গ্রহের এক বনে একটা হাওয়া পাক দিয়ে
উঠলো। ঝোড়ো নয়, হালকা হাওয়া। এই হাওয়া কিন্তু গল্পের শুরু নয়, শেষও নয়। কিন্তু একে
একরকম শুরু বলা যেতে পারে। হাওয়া পাক দিলো ঘন বনের পাশ দিয়ে, উপলখণ্ডের উপর দিয়ে,
খেত খামার ছাড়িয়ে এক ছোট্ট বাড়ির উঠোনে। এই পরিবারের জীবনে এর থেকে গুরুত্বপূর্ণ
দিন বোধহয় আর কখনো আসেনি।
... এই পর্যন্ত লিখে নিলয় পেনের
পিছন দিকটা মুখে দিয়ে ভাবতে বসলো, যে ওর প্রথম লিখতে বসা কল্পবিজ্ঞানের গল্পের
শুরুটা বেশিই হালকা হয়ে গেছে কি না। পেটে বদহজম হওয়া ‘Wheel of Time’ এর থেকেও
বেশি ইঞ্জিরি ছাড়া হয়ে গেছে কি না, তাই নিয়ে সামান্য দ্বিধাও দেখা দিল নিলয়ের মনে।
বড় কাগজে যত্ন করে ফেঁদে বসা গল্পটা কিভাবে খেলিয়ে তোলা যায়, অথচ ঝুলে যাওয়ার
উপক্রম না হয়, এ নিয়ে প্রবল চিন্তায় যখন নিলয় মগ্ন, তখন পাশের ঘর থেকে অ্যালার্ম
ঘড়ির মত নিলয়ের ছ’মাসের বাচ্চাটা বেজে উঠলো। “শালা, তোর পেটের ব্যবস্থা করতেই
লিখতে বসেছি রে গামবাট!” জাতীয় আরও অশ্লীল সব বাক্যবন্ধ মনের গোপনে ব্যবহার করে, মুখে
ধৈর্যের অ্যাডভার্টাইসমেন্ট হতে পারে এমন হাসি ঝুলিয়ে, ছেলেটাকে কাঁধে নিয়ে
শরীরটাকে সামান্য দুলিয়ে দুলিয়ে বাচ্চার পিঠ চাপড়ে, সাম্প্রতিক আইটেম সঙের খোকা
সংস্করণটা গুন গুন করে, তাকে ঘুম পাড়িয়ে ঘর্মাক্ত কলেবরে নিলয় যখন আবার এসে লেখার
টেবিলে বসলো, ততক্ষণে ওর মাথায় প্লটের ‘প’ও আর নেই। পাশের খাটে নিদ্রিত স্ত্রীয়ের
কলেবরের দিকে আড়চোখে দেখে মেজাজ এমন খিঁচড়ে গেলো, যে প্রতিজ্ঞা করে খাওয়া পঞ্চম
সিগারেটের পরের ষষ্ঠটি গোপন স্টক থেকে বের করে নিলয় বারান্দায় গিয়ে ধরালো।
... এই পর্যন্ত লিখেই সুনন্দের মনে
হলো, নেহাত লিখতেই হবে এই ভেবে, আর শ্রীময়ের থেকে মণিভূষণ ভট্টাচার্যের ‘নির্ঝরের
স্বপ্নভঙ্গ’ কবিতাটা নিয়েছে বলেই যে এই কায়দায় কোন গদ্যরীতি আমদানি করতে হবে, তার
তো কোন মানেই নেই! তাই কেন যে পাতাখানেক নষ্ট করা হলো এই ভেবে সুনন্দ খানিক ভাবুক
হয়ে পড়লো। হস্টেলের ঘরের জানালা দিয়ে যে মাঠটা দেখা যায়, সেখান দিয়ে হেঁটে যাওয়া
কুকুরের ডাকটাও কেমন যেন ‘ওঃ! কি আমার লেখক রে!’ গোছের বিদ্রূপাত্মক শোনালো। জগতের
ক্রমবর্ধমান রোশনাইয়ে অবশিষ্ট রহস্যগুলো কেন যে মুছে যাচ্ছে, সব চলে গেলে কি নিয়েই
বা লিখবো – ধরনের আলগা ফেনাবাসী ক্রাইসিস আক্রান্ত হয়ে আদর্শ অসফল বুদ্ধিজীবির মতো
সুনন্দ স্বগতোক্তি করলো, “কোনো শালা প্রতিভার দাম দিতে জানে না!” এই বলে আরও
পাঁচটা অসমাপ্ত কাজের মত লেখাটা ফেলে রেখে আয়নায় অন্যমনস্ক আত্ম-প্রতিবিম্ব
পর্যবেক্ষণ করতে করতে চুলে হাত বোলাচ্ছে, এমন সময়ে দরজায় ঠকঠক আওয়াজ। কেত নিয়ে
‘কাম ইন!’ বলেই নিজের ভুল বুঝতে পারলো সুনন্দ, আর একটু তাড়াতাড়িই দরজার ছিটকিনি
খুলে দিলো। আগন্তুক নিজেকে হস্টেলের কেয়ারটেকার বলে পরিচয় দিলেন আর পর্যাপ্ত
ভদ্রতার সঙ্গে বলে দিলেন যে আগামী এক মাসের মধ্যে সে যেন পাততাড়ি গুটিয়ে কোথাও
বিদেয় হয়। পিত্তি গেলে যাওয়া মাছের পেটি চিবোনোর মত মুখ করে দরজা লাগিয়ে সুনন্দ
যখন খাটে এসে বসলো, তখন কোথায় সংগ্রামী লেখকের যুদ্ধ, কোথায় পেটরোগা দর্শন – দৃশ্যতই
চাপ খেয়ে চুল হয়ে যাওয়া সুনন্দ আনমনে গান ধরলো। আজকেই শোনা গান, জুনিয়র একজন
শুনিয়েছে, অনুপমের “...আমার সব ঠাকুরেই ভক্তি”...
...আধঘন্টার মধ্যে এই নিয়ে
দ্বিতীয়বার একই গানের একই লাইন শুনে একই ভাবে বিষম খেয়ে মহাকালের মেজাজ যা হলো,
তাতে অন্তত আন্তর্নক্ষত্রপুঞ্জ কোনো সালিশি করা যায় না। কোয়ান্টাম কাব্যি মাথায়
উঠেছে, এখন কি নিয়ে বেশি চিন্তিত হওয়া উচিত – ভুঁইফোড় আঁতেলের লঘু জীবনদর্শন, নাকি
সমলিঙ্গ যৌনতা নিয়ে হালকা উদ্দীপনা, এ সব ফালতু কথা ভাবতে ভাবতে মহাকাল সময়ের
চাকায় বার পাঁচেক দম দিয়ে চাইনিজ অর্ডার করে একটা বিড়ি ধরিয়ে মহাপদ্মে হেলান
দিলেন। নামেই মহাপদ্ম, কয়েক বিলিয়ন বছরের ঘাম লেগে তৈরি হওয়া তেল চটচটে গন্ধটায়
নাক সইয়ে নিতে নিতে ওঁর আর খেয়াল ছিলনা, যে আপন মনে গুনগুন শুরু করেছিলেন, “...
আমি সেদ্ধভাতে আছি ভাই, রক্তপাতে নেই...” অলক্ষিতে এই গুঞ্জনের ফলে সৃষ্টি হওয়া
মহানাদের রেসোন্যান্সে খানচারেক নেবুলা যে মিলিয়ে গেল, সেটা আর ভদ্রলোকের চোখে
পড়েনি। যুগযুগান্তব্যাপী এই ভীষণ একঘেয়ে কাজটায় এমন ভুল হতেই পারে। লাভের মধ্যে,
ওই রেসোন্যান্স ক্ষয় পেতে পেতে যখন লিপযিগ গ্যালাক্সির ষষ্ঠ গ্রহের বনের পাশে
পৌঁছলো, তখন সেখানে ঝড় উঠেছে...
...এই পর্যন্ত লিখেই,...
Monday, September 16, 2013
'Chennai Express'ions... 1
চেন্নাইতে আসা এক মাস হয়ে গেল। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, কাছাকাছি বাজার-হাট দেখে নেওয়া, কাজ করার ঘর, টেবিল আর কম্পিউটার পাওয়া সবই মোটামুটি হয়ে গেছে, বাকি বলতে একটা সাইকেল জোগাড় করা আর প্রথম চেকটা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে আসা। দ্বিতীয়টা করতে গেলে প্রথমটা দরকার বলে দু’টোর কোনটাই করবো করবো করে আর করা হয়ে উঠছে না। তবু যাকে বলে সেট্ল্ করে গেছি। একটা নবীনবরণ গোছের অনুষ্ঠানও হয়ে গেছে। সোজা কথায় আমি এখন পাকাপোক্ত দক্ষিণ-ভারতের বাসিন্দা। কেমন আছি, কোথায় আছি, সেই নিয়ে নিয়মিত গল্প করবো বলেই লিখতে বসা। এর থেকে বেশি আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য নেই।
রাতের শেষ
প্রহরে ট্রেন থেকে নেমে কাজের জায়গায় আসতে গিয়েই পরিষ্কার বুঝলাম, কেন আসার আগে এত
লোকে এত শোক পালন করছিল। সত্যি, শোক পালন! “যা, এবার সারাদিন কি করে দোসা-ইডলি
খেয়ে কাটাস দেখি!” থেকে শুরু করে “আর যাওয়ার জায়গা পেলে না! ব্যাঙ্গালোর গেলেও
বুঝতাম... চেন্নাই! খুব খাজা জায়গা ভাই, সত্যি বলছি” পর্যন্ত কত কিই না শুনলাম।
যেন শখ করে জায়গা বেছেছি! ভারত সরকার কেন যে ট্যুরিস্ট-স্পটগুলোয় দেখে দেখে
ইন্সটিটিউট বানায় না, হুঁহ্– যাক্, সে আর দুঃখ করে কি হবে। সব মিলিয়ে বেশ
খানিকটা ভয় ছিলই, তার উপরে ভাষার অসুবিধে। ভাসা ভাসা জানা ছিল যে বহুদিন যাবৎ
এখানে হিন্দির বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছে – তাই কেউই ও ভাষায় কথা বলে না।
জানলেও বলে না। সে ঠিক আছে। তাহলে বলেটা কি? নিশ্চয়ই ইংরেজি? তাহলেও তো অসুবিধে
নেই- চালিয়ে নেবো। এইসব ভেবে দুগ্গা বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। পৌঁছে কি দেখলাম?
Thursday, March 28, 2013
আ মোলো বাংলাভাষা
যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঘা যতীনের দিকে যেতে সুলেখা মোড় পেরিয়ে ডানদিকে একটা ‘ক্যাফে কফি ডে’র আউটলেট। বিকেলের দিকে প্রায় প্রতিদিনই ফাঁকা থাকে। স্বাভাবিক। অন্তত ইউনিভার্সিটির গড়পড়তা ছাত্র-ছাত্রীরা যে এখানে আসবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। হাতখরচের টাকা বেশি খরচ করে খেতেই যদি হয়, তবে সামান্য দূরেই সাউথ সিটি আছে, বৈচিত্র্যের পসরা সাজিয়ে। এখানে আসে প্রধানত প্রেমী-যুগল – হয় ডাক্তারি, নয় ব্যবসার পিতৃদত্ত পয়সার মালিক, নয়তো নতুন প্রেমে পড়া মধ্যবিত্ত ছোকরা – ছোটবেলায় নচিকেতার ‘...মোটা মানিব্যাগ দেখে/ তোমাকে সাইডে রেখে/ দৌড়বে সোজা, সোজা দৌড়বে প্রেম...’ কথাটায় বেজায় ভয় পেয়ে তিনদিন টিফিন না খেয়ে জমানো টাকা উড়িয়ে মেয়েটিকে ইম্প্রেস করবে বলে, নয়তো মধ্যবয়স্কা নারীর দল – সমাজ বা প্যান্টালুন্স কিছু একটা উদ্ধার করে শরীর জুড়োতে আসা। এখানেই বসে গম্ভীর মুখে ল্যাপটপ খুলে দেশোদ্ধার করার ভান করছি। আসলে কিন্তু কান পড়ে আছে পাশের টেবিলে ট্যাঙ্ক-টপ আর হোঁৎকা বয়ফ্রেন্ডের অধিকারিণী চটকদার মেয়েটির কথার দিকে।
আজকের লেখার বিষয় এই কফিশপ-বিশ্বায়ন হতে পারতো – ‘আহা আমাদের কফি-হাউসের কি হবে গো!’ বলে চাড্ডি কান্নাকাটি করার সুযোগ থাকতো। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কি করে তরুণ সমাজের পকেটের গভীরতায় প্রতিফলিত হয়, সে নিয়ে পাঁচ পাতা প্যাঁচানো যেত। এমন কি ওই হোঁৎকা ছেলেটির ক্রমবর্ধমান মেদপুঞ্জ আসলে কিভাবে মুক্ত-বাণিজ্যের ষড়যন্ত্র আর ষড়রিপুর ফল, সে নিয়েও কিছু বিদ্যে ফলানো যেত – কিন্তু এ সব মাটি করল ওই মেয়েটা।
প্রথমে খেয়াল করিনি। আধা-ইংরেজি, আধা হিন্দিতে বকবক শুনে ভেবেছিলাম
ধুয়ে দাও হে
সত্য সূর্য ওঠে আকাশী চাঁদোয়া ঘেরা মাঠে
মিথ্যে সমস্তই চাঁদের আলোর মায়াময়
ভোর হলে ঘোর কাটে, গোলাপি নেশারা বাড়ি যায়
জ্ঞানীরা আয়না ভেবে পারা ঘষে ফেলে দেওয়া কাচে
কলেজ শিশুর মুখে শিক্ষিত চূন লেগে পরিধেয় হয়
সুশিক্ষা ফুল হয়ে জীবনের বৌভাতে লাগে
ঘোলা, অগভীর মনে, কিছু কথা কই হয়ে বাঁচে।
এখনো পড়েনি খুলে সমস্ত প্রসাধন, সব ধারণা-
উলঙ্গ অনুভূতি, দপদপে ধিক্কার, শরীরের শাক-চাপা আছে
বেশ্যা গালিও দেয়, অথচ সহজে কথা বলে
ঘোলামন, প্রসাধন ফেলে দিতে আমরা পারি না?
Subscribe to:
Posts (Atom)





