Thursday, March 28, 2013

আ মোলো বাংলাভাষা


যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঘা যতীনের দিকে যেতে সুলেখা মোড় পেরিয়ে ডানদিকে একটা ‘ক্যাফে কফি ডে’র আউটলেট। বিকেলের দিকে প্রায় প্রতিদিনই ফাঁকা থাকে। স্বাভাবিক। অন্তত ইউনিভার্সিটির গড়পড়তা ছাত্র-ছাত্রীরা যে এখানে আসবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। হাতখরচের টাকা বেশি খরচ করে খেতেই যদি হয়, তবে সামান্য দূরেই সাউথ সিটি আছে, বৈচিত্র্যের পসরা সাজিয়ে। এখানে আসে প্রধানত প্রেমী-যুগল – হয় ডাক্তারি, নয় ব্যবসার পিতৃদত্ত পয়সার মালিক, নয়তো নতুন প্রেমে পড়া মধ্যবিত্ত ছোকরা – ছোটবেলায় নচিকেতার ‘...মোটা মানিব্যাগ দেখে/ তোমাকে সাইডে রেখে/ দৌড়বে সোজা, সোজা দৌড়বে প্রেম...’ কথাটায় বেজায় ভয় পেয়ে তিনদিন টিফিন না খেয়ে জমানো টাকা উড়িয়ে মেয়েটিকে ইম্প্রেস করবে বলে, নয়তো মধ্যবয়স্কা নারীর দল – সমাজ বা প্যান্টালুন্‌স কিছু একটা উদ্ধার করে শরীর জুড়োতে আসা। এখানেই বসে গম্ভীর মুখে ল্যাপটপ খুলে দেশোদ্ধার করার ভান করছি। আসলে কিন্তু কান পড়ে আছে পাশের টেবিলে ট্যাঙ্ক-টপ আর হোঁৎকা বয়ফ্রেন্ডের অধিকারিণী চটকদার মেয়েটির কথার দিকে।

আজকের লেখার বিষয় এই কফিশপ-বিশ্বায়ন হতে পারতো – ‘আহা আমাদের কফি-হাউসের কি হবে গো!’ বলে চাড্ডি কান্নাকাটি করার সুযোগ থাকতো। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কি করে তরুণ সমাজের পকেটের গভীরতায় প্রতিফলিত হয়, সে নিয়ে পাঁচ পাতা প্যাঁচানো যেত। এমন কি ওই হোঁৎকা ছেলেটির ক্রমবর্ধমান মেদপুঞ্জ আসলে কিভাবে মুক্ত-বাণিজ্যের ষড়যন্ত্র আর ষড়রিপুর ফল, সে নিয়েও কিছু বিদ্যে ফলানো যেত – কিন্তু এ সব মাটি করল ওই মেয়েটা। 

প্রথমে খেয়াল করিনি। আধা-ইংরেজি, আধা হিন্দিতে বকবক শুনে ভেবেছিলাম
অবাঙালি। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই যখন সেলফোনে “মাম্মা, তুম্‌হে তো মালুম হ্যায়, হাউ আই হ্যাভ টু সাফার- ওকে সহ্য করা যায় না!” বলে উঠলো, বাক্যের শেষাংশ শুনে একটু চমকাতেই হলো। তারপর এই আধঘণ্টাটাক বসে আছি, এতক্ষণে পরিষ্কার যে এ মেয়ে নির্ঘাত বাঙালি। বিশ্বাস করুন, তিনটে ভাষার সবক’টাই এ প্রতিটি বাক্যে মিশিয়ে দেয়। এটাকে গুণ বলে ভাবাই যেত, যদি না প্রতিটা ‘কম’ – ‘কম’ আর ‘ক্যাম’ এর মাঝামাঝি শোনাতো – হিন্দিতে যেমন হয়। ইতিমধ্যে পাঠিকা/ পাঠকের জ্বলতে শুরু করেছে জানি। ভাবতে শুরু করেছেন- ‘অ, তুমি কলকাত্তাইয়া মাল, ভাষার কৌমার্য গেল, গেল বলে স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের মত চেল্লাবে?’ না, মোটেই তা নয়। আমি দিব্য ‘ধরি মাছ, না ছুঁই পানি’ গোত্রের ফেনা-বাসী মানুষ, ও সব ভাষা-ফাসার চারিত্রিক শুদ্ধতা নিয়ে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। হোর্ডিং আর বিলবোর্ডে বাংলা লেখা আছে, না সোয়াহিলি – তা নিয়ে প্রয়াত সুনীল গাঙ্গুলির মাথার চুল সাদা করা মানায়, আমার কিস্যুটি মনে হয় না।

তবু যে অস্বস্তিটা বোধ করা শুরু করলাম, তার কারণ আছে। নতুন নয়, বেশ পুরনো কারণ। আনন্দবাজারের ওই একটা কলাম থাকতো না, রবিবারের পাতায়, ‘আলু আপনি...,’ ‘পটল আপনি...’? সেখানে প্রায় বছর আষ্টেক আগে একবার ‘রাইমা আপনি...’ বলে একটা সাক্ষাৎকার বেরিয়েছিল। বক্তব্য কিচ্ছুটি মনে নেই, এই ধরুন- “আমার ও সব মডেলিং-এ যাওয়ার ইচ্ছে নেই, কেন কি, আমার মা চান না...”- এইরকম কিছু একটা বলেছিলেন গবাক্ষ-সুন্দরী। বুঝতেই পারছেন, হিন্দি ‘কিঁউ কি’র সোজা বাংলা করে বলা ‘কেন কি’ পড়ে বিষম-টিষম খেয়ে সে যা-তা অবস্থা! তা সে সব অতীত। মাতৃভাষার শুদ্ধতা রক্ষার দায় যে এই ঘাড়ে অন্তত নেই, সেটা ঘাড়ে ঘাড়ে টের পাওয়া গেছে এদ্দিনে। বাংলা মিডিয়াম স্কুলগুলো চুপচাপ দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হয়ে গেছে, বড়দা ইংরেজিকে জায়গা ছেড়ে দিয়ে। কে আর অত মাথা ঘামায়! 

সত্যিই ঘামায় না, তাই না? চলুন, একটা খেলা খেলি। কতগুলো সোজা সোজা প্রশ্ন করবো, আপনি উত্তরগুলো ভাববেন। প্রথম প্রশ্ন: শেষ কবে বাংলা বই পড়েছেন? ও সব ব্লগ-ফ্লগ নয়, বাংলা দৈনিকের ইন্টারনেট এডিশনের ফেসবুক-ট্যুইটারে শেয়ার করা খবরও নয়, প্রতিদিনের ‘রোববারে’ পড়া পলাশবরণের বা চন্দ্রিলের লেখার স্ক্রিনশটও নয়। গোটা একটা বাংলা বই? 
দ্বিতীয়: যেটা পড়েছিলেন, সেটার লেখক/লেখিকা কোন সময়ের? বাপের যুগের হলেও চলবে না। আপনার সময়ের কোনো লেখকের কি? তৃতীয়: এটা মোক্ষম- এই যুগের লেখা হলে, সেটা কি মনে রাখার মতো ভাল ছিল? 

চিন্তা করবেন না, এই সবক’টা প্রশ্নই নিজেকে করেছি আর উত্তর এখনই দিচ্ছিনা। আপনি নেহাত ব্যতিক্রম না হলে, এগুলোর উত্তর সব নেতিবাচক আসবে। ঝটিতি মনে করে বলতে পারেন, এ যুগের পাঁচজন বাঙালি লেখক/ লেখিকার নাম? পূজাবার্ষিকী ছাড়া তাঁদের লেখা পড়ার সময় হয়? শীর্ষেন্দু-সুনীল-অতীন-নারায়ণ-লীলা-মতি-দুই সমরেশ-বুদ্ধদেব-তারাপদ- আরও যাদের নাম এক ঝটকায় আমার মনে আসছেনা, কিন্তু আপনার আসছে আর কেন এই লিস্টে নেই ভেবে আমায় গাল পাড়বার উপক্রম করেছেন, সবাই কিন্তু আগের প্রজন্ম, কয়েকজন ইতিমধ্যেই গত। ঘুরে ফিরে সেই গুরুবুড়ো, শরদিন্দু আর শরৎ ফাটিয়ে বইমেলা রমরম করে চলছে। ননস্টপ বেস্টসেলারের লিস্টে গেঁড়ে বসে আছেন রায় বংশের তিন প্রজন্ম, আঁতেলরা নোবেল-বিজয়ীর বইয়ের আনন্দকৃত বাংলা অনুবাদ পড়ছে, গোঁয়ার কমিউনিস্ট পোকা ধরা রাদুগার বই আঁকড়ে সবাইকে ডেকে পড়ানোর চেষ্টা করছে, কিছু ভাগ্যবান খোকাখুকি ‘আমার মা সব জানে’ পড়ে বিজ্ঞান পড়তে উৎসাহ পাচ্ছে- ব্যস্‌।

ভুল বুঝবেন না। নতুন বই পোচ্চুর লেখা হচ্ছে, ছাপা হচ্ছে। তিলোত্তমা জমাটি উপন্যাস থেকে রগরগের দিকে টার্ন নিয়েছেন। একজন বয়স্কা লেখিকা থোড়-বড়ি-খাড়াকে কি করে খাড়া-বড়ি-থোড় করে রান্না করা যায় তার আপ্রাণ চেষ্টায় রত। সে লেখা থেকে ছেনেমাও হচ্ছে। আর এক সত্যিকারের বিদুষী তাঁর খ্যাতনামা ‘এক্স’কে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। ‘পিতৃপক্ষ’ জোরকদমে শুরু হয়ে ফুস করে শেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রবল পরিশ্রমে আধুনিক হতে গিয়েও কেউ ‘পাল্টা হাওয়া’য় উড়ছেন তো কেউ লেখার চেষ্টা ছেড়ে ‘প্যান্টি’র দিকে মন দিয়েছেন। আরও কেউ কেউ তুমুল প্রতিভা নিয়েও মেনস্ট্রিমে পাত্তা না পেয়ে ইন্টারনেটেই খান্ডবদাহন শুরু করেছেন। মৌসুমী প্রকাশনের ইন্দ্রজিৎদের না হয় হিসেবের বাইরেই রাখলাম। 

সব সত্যি। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এ সব পড়ছে ক’জন? বই পড়া দূরে থাকুক, বাংলা পড়তে শিখছে ক’জন? সদ্য এই লেখাটা পড়ে আর তৎসংলগ্ন মন্তব্যের হা-হুতাশ পড়ে সন্দেহ আরও ঘনিয়ে উঠলো। ওই যে আমিষ না নিরামিষ কি যেন নাম ভদ্রলোকের, তাঁর অতি জোলো ইঞ্জিরিতে লেখা প্রবল গাঁজাখুরি গপ্পোটারও কি বেজায় বিক্কিরি। শিব শিব! এমনকি মোবাইলেও বিজ্ঞাপন আসছে- অমুক দিক তমুক ঘটিকায় লেখকের মোহময় সৎসঙ্গের অসামান্য সুযোগ পেতে হলে চলে আসুন... এক ইঞ্জিনিয়ারের ব্যাটা নব্বইয়ের ফর্মুলা সিনেমার মতো ফর্মুলা গপ্পো লিখে সেলিব্রিটি হয়ে গেল দিব্যি! ও লেখা বাংলায় উৎকৃষ্ট অনুবাদ করে প্রথমবার কোথাও ছাপতে দিন দেখি- ঠোঙা করে শিঙাড়া নিয়ে আসবেন, বই আর পড়তে হবে না।

কাঁদুনি থাক। ও সব অনেক হয়েছে। আসল কথা হলো, সত্যিটা কি? বাংলা কি একটা মৃতপ্রায় ভাষা, যার জানাজা টানার সময় হয়ে গেছে, কিন্তু আমরা কিছুতেই মানতে রাজি নই বলে মমি কাঁধে বসে আছি? নাকি ফিনিক্সের মতো আবার উড়বে একদিন? (দুঃখিত, ক্লিষ্ট ক্লিশে হলেও ব্যবহার করতে বাধ্য হলাম, আর কোনো পাখি আছে কি এরকম? জানা নেই যে!)
আমার যা মনে হয়, সেটা এবার বলেই দিই- 

ভারতবর্ষের অন্তর্ভুক্ত বাংলায়, যাকে আমরা কায়দা করে পশ্চিমবঙ্গ বলি, সেখানে বাংলার মৃত্যুঘণ্টা বেজে গেছে। মারাঠি, পাঞ্জাবি, ভোজপুরি, উর্দু- সব মিলে গিয়ে এখন যেমন হিন্দির একটা চেহারা হয়েছে, সেটা আরও বদলাবে- লাইনে এর পরে আছে বাংলা। উচ্চশিক্ষা, হিন্দির দৌরাত্ম্য, ইংরেজির দাপট আর বাপ-মায়েদের ক্যলাসনেসের দায় বহন করে এ ভাষা একদিন অতীত হবে। হয়তো অদূর ভবিষ্যতে নয়- আরও কিছুদিন গোঁয়ার বলীবর্দের মতো ‘জগত-সভায় শ্রেষ্ঠ আসন লবে’ চিল্লিয়ে একে টিকিয়ে রাখবে পুঁচকে-পত্রিকা আর ব্লগার গোষ্ঠী। তীব্র বিরক্তিতে মুখ কুঁচকেও কিছুতেই ‘#@! জ্বলে গেল’ না বলে ‘কি ভীষণ বিরক্তিকর’ বলে শুদ্ধতাবাদীরা বাংলার চোদ্দ-গুষ্টি উদ্ধার করার ভেজা স্বপ্ন দেখবে। ‘ইস্‌, দেখেছিস, বাংলাদেশের ব্লগারগুলো কেমন একটা বিচ্ছিরি করে লেখে! “আমার আসলেই খিদে পেয়েছে”- আসলেই আবার কি রে! বল্‌, “আমার সত্যিই খিদে পেয়েছে”... সত্যি!!’ – বলে কেমন দিলুম গোছের মুখ করে চরম আত্মপ্রসাদ লাভ করবে। 

তারপর? তারপর আবার কি! চোখ বন্ধ নাকি আপনার? দেখতে পাচ্ছেন না, বাংলা কেমন হতে চলেছে? সুমন-অঞ্জন-চন্দ্রবিন্দু টসকে গেলে আপনার জন্য গান লিখবে কে, সোমলতা? ও-পার বাংলা মশাই, ও-পার বাংলা। যতই আপনি বা আপনার ছেলে-মেয়ে বিদেশ গিয়ে বাংলা বাংলা করে কেঁদে ভাসান না কেন, ও আর নেই। ভাষার মিডিয়াম কই? উপন্যাস, গল্প- ও সব ফ্যান্টাসি, বিদিশি গোয়েন্দা বা এস্পিয়োনাজ নিয়ে না হলে কেউ পড়ে না, আর শেষ ফেলুদা মরে গেছে। খবর কাগজের গল্প, সম্পাদকীয়- ও সব রিপ্লেস হবে যা দিয়ে তার একটা প্রিভিউ দেখতে হলে আনন্দবাজার- বিনোদন বা ওয়ান-স্টপ খুলে পড়ুন। একমেবাদ্বিতীয়ম্‌ ইন্টারনেট- সেখানে একবার গিয়ে দেখুন দিকি, এ-পার বাংলা আর ও-পার বাংলার রেশিও ঠিক কি? অঙ্ক বাদ দিন, সংগঠিত কোন দল আছে লেখকদের এপারে? সচলায়তনের কোন বিকল্প? গুরুচণ্ডা৯র এখনো অনেক পথ যাওয়া বাকি। 

আছে বলতে অনেক কিছু। বুদ্ধি, লোকবল, পরিশ্রম, কারিগরি সাহায্য- কিচ্ছুটির অভাব নেই আমাদের। কিন্তু সে সব বাংলায় কেন হবে বলুন তো? ইংরেজিতে হবে! আপনার সদ্যোজাতটি কোন দুঃখে দুনিয়ার খবর জানতে বাংলা সাইট খুলবে বলুন দেখি? গনগনে অনুভূতি সরিয়ে সত্যি করে বুকে হাত রেখে বলুন- কেন পড়বে স্কুল সিলেবাসের ‘বেঙ্গলি’? আপনি কতটা মন দিয়ে সংস্কৃত পড়েছিলেন? বহুভাষী হওয়া খুব ভাল ব্যাপার। কিন্তু যদি কেউ দেখে একটা ভাষা ভাল করে শিখেই দিব্যি সব কাজকম্মো চালানো যাচ্ছে, আনন্দ পাওয়া যাচ্ছে, অধিকাংশ দরজা খোলা থাকছে, তবে সে যদি আর চাপ না নিতে চায়, মাতৃভাষা হোক বা না হোক, বাংলা পড়ার তার দায় নেই। আদ্যন্ত ফাঁকিবাজ জাত আমরা, এক্ষেত্রেই বা ফাঁকি দেবো না কেন?

হয়তো পড়বে, সীমান্তের ওপারের ছেলে-মেয়েগুলো। হয়তো সত্যিই ‘আমি বাংলায় গান গাই’ বলতে ওদের ভাল লাগবে, বছরের একদিনের ন্যাকামি মনে হবে না।

না, আমি বিশ্বাস করিনা বাংলা একটা মরণোন্মুখ ভাষা। এখনো অনেক পথ যাওয়া বাকি বাংলার। পরিভাষার শেকল কেটে, এস.এম.এস চ্যাটের বয়ঃসন্ধি পেরিয়ে, আঞ্চলিকতাকে বিপত্তির বদলে ব্যাপ্তি ভেবে এখনো অনেক প্রজন্মের প্রথম প্রেম হবে বাংলা।
তবে কেঁদে লাভ নেই, ভবিষ্যতের বাংলায় বেজায় ইলিশ ইলিশ গন্ধ, চিংড়ির নামমাত্রও নেই...
অবশ্য, দিব্যি খেতে!