Sunday, August 7, 2016

টেঁপি


দু’পাশে দু’টো উঁচু উঁচু ফ্ল্যাটবাড়ি- মুখোমুখি দু’টো জানালা, দু’টো ব্যালকনি। একদিকের ফ্ল্যাটে কেউ থাকেনা, অন্যদিকে দুই বুড়োবুড়ি সারাদিন দরজা-জানালা বন্ধ করে বসে থাকে। আমি আর টেঁপি প্রতিদিন এই দুই বাড়ির মাঝের ফাঁকা জায়গায় এসে বসি। বেশ ছিলো, এই গতমাসে সামনের ফাঁকা ফ্ল্যাটটায় প্রথম হৈ-হট্টগোল শোনা গেলো। জোর আওয়াজ- অনেক লোক, অনেক জিনিসপত্র বাইরে থেকে ভেতরে ঢুকলো- বাড়িতে নতুন ভাড়াটে এসেছে। স্বামী-স্ত্রী, দুইজন। কমবয়স, সদ্য বিয়ে হয়েছে বোঝা যায়। দিন তিনেকের মধ্যেই সাজিয়ে গুছিয়ে ফেললো সংসার। দেখলাম, ওদের মধ্যে খুব ভাব। এর বেশি আর আমরা লক্ষ্য করিনি।
মাঝে মধ্যে বউটা ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ায়, আমাদের দিকে তাকায়- ইতিউতিও চায়। আমরা ওকে বিশেষ পাত্তা দিইনা। বউটা সারাদিন একলা থাকে। বর সকাল সকাল অফিস যায়, সন্ধ্যে হলে ফেরে। সন্ধ্যের পর যেহেতু আমি আর টেঁপি ওই তল্লাটে বিশেষ থাকিনা, তাই তারপর কি হয়, আমাদের আর জানা হয় না।

আজ সকালে খুব গোলমালের আওয়াজ শোনা গেলো ওই বাড়ি থেকে। চীৎকার-চেঁচামেচি, নারীকন্ঠে কান্নার শব্দ, পুরুষকন্ঠে চাপা হুমকি। ছেলেটা যেন একটু তাড়াতাড়িই অফিসে বেরিয়ে গেলো। আমরা নিজেদের কাজে মন দিলাম। মেয়েটা সারা সকাল, সারা দুপুর, সারা দিন উদাস হয়ে বাইরের দিকে তাকিয়ে ব্যালকনিতে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকলো। অঝোরে কাঁদছিলোও মনে হয়। আমি দেখিনি, টেঁপি দেখালো। তারপর যা হয়, কান্না একসময় থেমেও গেলো।
বিকেল হওয়ার একটু আগে চোখ মুছে ফেলে ভেতরে চলে গেলো মেয়েটা। একটু পরে দরজার শব্দ- তারপর আমাদের সামনে দিয়েই রাস্তা দিয়ে কোথায় যেন চলে গেলো। আমরা অপেক্ষা করলাম। সূর্য ডোবার পরে টেঁপি আর ওখানে থাকতে চায় না বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও আমায় যেতে হলো।
পরদিন একটু তাড়াতাড়িই এসে বসলাম আমাদের জায়গায়। ছেলেটা আজ অফিস যায়নি। মেয়েটাও এখনো ফেরেনি। বদলে আজ ছেলেটাই এসে দাঁড়িয়ে আছে ওই ব্যালকনিতে। সিগারেট খাচ্ছে। মাঝে মধ্যে একে তাকে ফোন করছে আর এসব যখন করছে না, তখন মাথা চেপে দাঁড়িয়ে থাকছে রেলিং ধরে। বেশ কিছুক্ষণ পরে যখন মাথা তুললো, লাল চোখ সোজা পড়লো আমার চোখে। আমি তক্কে তক্কেই ছিলাম। টেঁপির মাথাটা একটু চুলকে দিলাম আদর করে। টেঁপি বাদাম খাচ্ছিলো একমনে। চমকে আমার দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো ব্যাপারটা। তাই আবার নিশ্চিন্তে খাওয়ায় মন দিলো।
এদিকে যা হওয়ার হয়ে গেছে। ছেলেটা একদৃষ্টে কিছুক্ষণ আমাদের দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর ঝড়ের মতো ঘরে ঢুকে জামা-কাপড় পরে বেরিয়ে গেলো বাড়ি থেকে।

মেয়েটা যখন বাড়ি ফিরলো, তখন মাঝদুপুর পেরিয়ে গেছে। নাঃ, মেয়েটা একাই ফিরলো, ছেলেটা ফেরেনি। বেশ কিছুক্ষণ ঘরে খুটখাট করে অবশেষে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়ালো। আমাদের এখনো দেখতে পায়নি। ওর সমস্ত মন রাস্তার দিকে পড়ে আছে।
ছেলেটা বাড়ি ফিরলো যখন, তখনো মেয়েটা ব্যালকনিতে। একটা মোড়ায় বসে রেলিঙে মাথা রেখেছিলো। তাই একে অন্যকে দেখতে পায়নি। ঘরের দরজায় বোধহয় ইয়েল লক লাগানো, কারণ ছেলেটা এসে বেল না বাজিয়ে ঢুকতে পেরেছিলো। যখন বারান্দায় এসে দাঁড়ালো, আমি একবার টেঁপির দিকে তাকিয়ে দেখি, ও ঘাড় সোজা করে রুদ্ধশ্বাসে ওদের দেখছে।
ঠিক যেভাবে ঝগড়ার পরে আমি আর টেঁপি ভাব করি, সেভাবেই ওরা ভাব করলো। একটু বেশিই কাঁদলো। তা সে নতুন বিয়ে হয়েছে, হতেই পারে। ঘন্টাখানেক পরে ছেলেটার কাঁধে মাথা রেখে মেয়েটা এসে দাঁড়ালো বারান্দায়।
কিছুক্ষণ পরে, আজকে প্রথম, আমাদের দিকে নজর পড়লো ওর। বরকে বললো, “দেখো, ওই চড়ুই দুটো না, বর-বউ... আমাদের মতো।” বরটা আমার দিকে তাকিয়ে মাথাটা একটু নামিয়ে হেসে বললো, “জানি”।

সূর্য ডুবছিলো, তাই সেদিনের মতো আমরা উড়ে পালালাম।

Thursday, May 1, 2014

প্রৌঢ় বনাম রিসার্চ স্কলার



প্রায় পুরো কর্মজীবন পার করে এসে এই বছর দুয়েক আগে তীরে এসে তরী ডোবার মতো আমি ফাঁদে পড়লাম। নাকি জাল বলবো? আন্তর্জাল। ইন্টারনেট। অফুরন্ত তথ্যের ভাঁড়ার, তার সঙ্গে সময় কাটানোর লাস ভেগাস। কিছুদিনের মধ্যেই পরিচিত হলাম ফেসবুক নামের গহ্বরটির সঙ্গে, বাঙালরা যাকে এখন খোমাখাতা বলে দেখি। এখন আমি একজন গর্বিত সোশ্যাল নেট-ওয়ার্কার। সারা দিন ভার্চুয়াল মোষ তাড়িয়ে বেড়িয়ে দিনের শেষে প্রবল আত্মপ্রসাদ লাভ করি। কি নেই সেখানে? আন্দোলন চলছে, বিজ্ঞাপন হচ্ছে, লোক ঠকছে, ঠকাচ্ছে, প্রত্যেকে মতামত দিচ্ছে, তাতে পালটা মতামত আসছে- একটা অসম্ভব আকর্ষণীয় বিশ্বব্যাপী রকবাজি। ছোটরা এর সঙ্গে আবার তোমাদের ‘ইউ রক, আই রক’ বা তথাকথিত সঙ্গীতের ধরনটিকে গুলিয়ে বোসোনা। আড্ডার মানে আমাদের কাছে ছিলো রকবাজি। কেমন ছিল সেটা? এই আমি তুমি ফেসবুকে এখন যা করি, তা-ই, তবে অনেক সীমিত পরিসরে। তা সে যাক গে, অনেক রকম গোষ্ঠীর সঙ্গে পরিচয় হলো, তাদের আশা-আকাঙ্খা, অভাব-অভিযোগ, আনন্দ-বেদনা, এমন কি নিজেদের নিয়ে মস্করাও দেখলাম, জানলাম। কিছু ভালো লাগলো, বাকি পাত্তা দিলাম না। লোকে অমন বলে। নিজে যা করে, সেটাকে খুব বড় করে দেখতে পায় বলে, সেগুলো অযথা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বাকি দুনিয়া দেখা যায় না। সে সবকে এতটা বয়স পার করে এসে আর গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করি না। এভাবেই একদিন জানতে পারলাম এক গোষ্ঠীর সম্পর্কে, যারা ঠিক পুরোদস্তুর গবেষক নয়, সে রাস্তায় এগোচ্ছে মাত্র। বাছুর স্টেজে আছে বলতে পারেন। এরা অধিকাংশ ডক্টরেট পাওয়ার লক্ষ্যে অবিচল। কিছু, সেই গন্ডি পার করে ধোঁয়াটে কি একটা করে। কাজটার নাম সম্ভবত নিজেরাও না জানায় সেটাকে পোস্ট-ডক্টরেট বলে চালায়। এদের বয়স আমার ছেলে-মেয়ের মতোই। ২৫ থেকে ৩০।

তা এদের স্ট্যাটাস আপডেট এবং শেয়ার করায় একটু চোখ বোলালে বোঝা যায়, এরা উচ্চশিক্ষিত- যেটা স্বাভাবিক- উচ্চশিক্ষাই তো এদের কাজ! এরা সাধারণত ভালো গান শোনে, প্রধানত ক্লাসিকাল, নয় বিদিশি নাম না জানা সব গানের দল। ভালো সিনেমা দেখে- প্রায় সব ধরনের, পোসেনজিতের ছাড়া। খেলা নিয়েও যথোপযুক্ত উৎসাহ রয়েছে। আর হ্যাঁ, ছবি তোলা। সংক্ষেপে বলতে গেলে জগতের প্রায় সব ভালো বিষয়েই উৎসাহ রয়েছে। ভালই লাগলো এদের দেখে। দেশের এরাই তো ভবিষ্যৎ! তাই যখন স্কলারশিপ না বাড়া নিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছে কেউ, ওদের সমর্থনই করেছি।

তা, এই গত সপ্তাহে এমন একটি ছেলে, আমার ছেলের বন্ধু, বিজ্ঞানে গবেষণা করে- এলো আমাদের বাড়িতে। ছেলের আসতে একটু দেরি থাকায় আমিই বসলাম তার সাথে আড্ডা দিতে, বেশ উৎসাহ আর কৌতূহল নিয়েই। এ কথা-সে কথা- ভদ্রতার পর জিজ্ঞেস করতে শুরু করলাম তার পেশা নিয়ে। অর্বাচীন অশিক্ষিত বুড়ো, তাই বোধহয় বেমক্কা খুব আজে বাজে কথা বলে ফেলেছি। গল্পের শেষের দিকে সে বেশ চটে উঠেছিল। আমি ভারী দুঃখিত। বাপু, তুমি এখন এই লেখাটা পড়লে মার্জনা কোরো এই মূর্খকে। কি এমন কথা হলো?

আমি জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা, তোমায় যে সরকার টাকা দেয় বলছো, কেন দেয়? স্কুল কলেজের স্কলারশিপের কথা জানি, পরীক্ষার রেজাল্ট বেরনো অবধি দেয়- মেধাবী কিন্তু গরীব ছেলেকে, যাতে সে শিক্ষাটা সম্পূর্ণ করতে পারে। তোমায় কেন দেয়? তোমার তো আমার ছেলের মতোই বয়স- চাকরি বাকরি করে এ সব করা যায় না? এই প্রশ্নে ছেলেটি আমার দিকে বেশ হতাশ হয়ে তাকিয়ে বললো, আসলে তা নয়। ও যা করছে, সেটা সফল হলে সেটা সরকারের সম্পত্তি হয়ে যাবে। কোন কোম্পানী পাবে না। বুঝলাম। কিন্তু যদি সফল না হও? তাও না হয় বুঝলাম, এটা সরকারের দায়িত্ব। এর পর এই নিয়ে কাজ শেষ করে কি করবে? চাকরি, নাকি ব্যবসা? তাতে বেশ বিরক্ত হয়েই বললো, এর কোনটাই করবে না। আরো পড়াশুনো করবে। শুনে একটু অবাক লাগলো। তাও বললাম, ভালো। কিন্তু সেটা করবে কোথায়? উত্তরে বললো, বিদেশ যাওয়ার পরিকল্পনা আছে। সে কি রকম কথা? সরকার পয়সা দিয়ে পড়ালো, তারপর বিদেশ চলে যাবে? নিশ্চয়ই ফেরারও প্ল্যান আছে? তাতে জানলাম, অত সোজা নয়, ফিরে তেমন চাকরিই নাকি আজকাল পাওয়া যায় না। তেমন হলে বিদেশেই থাকবে। একটু বোকার মতোই জিজ্ঞেস করে বসলাম, কিন্তু বাবা, বয়স তো হয়ে যাচ্ছে, বিয়ে থা কিছু করবে বলে ভাবোনি? এবার সে নড়ে চড়ে বসে আমায় বোঝাতে শুরু করলো, আমি কত আদিম যুগে পড়ে আছি, দুনিয়া কত এগিয়ে গেছে, কেন আমরা চাকরি-বিয়ে-সংসার এ সবের বাইরে ভাবতে পারি না, এ সব। বয়স নিয়ে খোঁটা দিলে আমার বেশ রাগ হয়, তাই আর কিছু বলিনি।

এর পর এদের নিয়ে খোঁজখবর রাখতে শুরু করলাম। হাতে কাজ না থাকলে যা হয় আর কি। কতকগুলো অদ্ভুত ব্যাপার লক্ষ্য করলাম, অনেক মজার ব্যাপারও। সব দেখে শুনে এই গোষ্ঠীটাকে আর বিশেষ পছন্দ হচ্ছে না। কি দেখলাম?

দেখলাম, এরা দেশটাকে বিশেষ পাত্তা দেয় না। না, আমি সমাজ, জাতি, গরীব মানুষ- এ সব নিয়ে বলছি না। এরা কোন খবরই রাখে না। এমন কি খবরের কাগজের শিরোনামটাও না। কিছু কিছু সামাজিক ইস্যু এদের খুব প্রিয়, যেমন বাক্‌স্বাধীনতা, নারীর সমান মর্যাদা, সমকামিতার স্বীকৃতি। এ বাদে দেশের রাজনীতি, অর্থনৈতিক অবস্থা, বিদেশনীতি- কিছুই এদের চোখে পড়ে না। এমন কি গোটা দেশের লোক বাজারের আকাশছোঁয়া দাম নিয়ে যখন চিন্তিত, এরা গাল দেয়, কেন এদের স্কলারশিপ আরও বাড়ানো হচ্ছে না। একজনকেও মূল্যবৃদ্ধি নিয়ে চিন্তা করতে দেখিনি। এরা চাকুরেদের করুণার চোখে দেখে। তারা যেন ঠিক মানুষ নয়। তারা যে কাজটা করে, সেটা ঠিক ‘কাজ’ নয়। মাছি মারা বলতে পারেন। সবাই পারে, নেহাত চায় না, তাই করে না। কেরানি আর ইঞ্জিনিয়াররা এদের খুব প্রিয় উপহাসের বস্তু। ডাক্তাররা এদের থেকেও বেশি সময় ধরে শিক্ষা শেষ করেন, তাই বোধহয় বেঁচে গেছেন। আচ্ছা, এদের স্কলারশিপের কাজও তো কোন একজন কেরানিই করে দেন? ইঞ্জিনিয়ারগুলো সারা দিন আজে বাজে কাজ করে, মনও ভালো থাকেনা, প্রচুর টাকা পায় কিন্তু। সেই টাকা দিয়ে নিজে ভালো থাকে, বাড়ির লোককে ভালো রাখে, বিয়ে করার সাহস পায়, বংশবৃদ্ধিরও। এর আগের সব কথাগুলো বুড়োর প্রলাপ বলে চালিয়ে দিতে পারো, এইটে পারবে না। এই স্কলার ব্যাটারা বিয়ে করে না- করতে ভয় পায় বলে। নিজে দু’দিন পরে কি খাবে ঠিক নেই, সংসার করার মুরোদ আসবে কোথা থেকে? তাই ‘আমার এখন ও সবের ইচ্ছে নেই’ বলে চালায়। ইচ্ছে আবার নেই! বাঘের মাংসে অরুচি! সারা দিন দেখি গাইড (যে ব্যক্তি এই বাছুরদের সঠিক পথে পরিচালিত করেন)-এর প্রতি নানা রকম ক্ষোভ, ঠাট্টা, বিরক্তি উগ্‌রে দিচ্ছে; স্কুল টিচারদের বেতন তাদের স্কলারশিপের থেকে বেশি হয়ে গেলে বাঁকা হাসি হেসে সে খবর শেয়ার করে। মানে দ্যাখ, অশিক্ষিতগুলোও আমাদের থেকে বেশি পায়। আমাদের দাম দিতে পারলো না এই গবেটের দেশ- অতএব চল ইউরোপ আমেরিকা যাই।

আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন, এতে আমার গা জ্বালার কি আছে? গা জ্বালার আবার কারণ থাকে নাকি? তবে এতো সহজে কিছু বলতাম না। আচ্ছা, এত তো আবিষ্কারের খবর আসে চারপাশ থেকে- তাতে ভারতীয়রাও কম নেই- কিন্তু দেশের ক’টা ইউনিভার্সিটির নাম শুনতে পান বলুন তো? ওই দু’একটা সরকারি সংস্থা,যেখানে কাজ করলেই আবার ডক্টরেট হয়না, তাদেরি তো নাম দেখি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে। এদিকে এত এত ছেলে-মেয়ে পিলপিল করে সারা দিন দেখি ‘রিসার্চ’ করছে- করছে টা কি? গুচ্ছের টাকা পায়। বিদেশে শুনেছি টাকার যোগাড় করতে অনেকে ক্লাস নেয় বা অন্য কাজ করে- এখানে? পুরোটাই সরকার, মানে আমার আপনার ট্যাক্সের পয়সা। সবার কাজের মুল্যায়ন আছে, RTI আছে, এদের কিন্তু সে সবের বালাই নেই। কে আদতে কি করছে সে খোঁজ নিতে গেলে দেখবেন, খান পাঁচেক ‘পেপার’ নামের এক ধরণের বস্তু বিভিন্ন বিদিশি জার্নালে (এখানেও দিশিদের কদর নেই) প্রকাশ করে নিজেদের ছোট্ট গোষ্ঠীর একে অন্যের পিঠ চাপড়াচ্ছে আর আহা-উহু করছে। ব্যস্‌! কোন আউটপুট নেই, মূল্যায়ন নেই- এমন কি বাজি রেখে বলতে পারি আপনাদের যারা স্কলার নন বা ছিলেন না, তারা এদের নিয়ে তেমন খবরই রাখেন না। এরা খবরে আসে না, আন্দোলনে যায় না, দেশের উন্নতিতে যত, বিদেশের উন্নতিতে অবদান তার থেকে বেশি, আমার-আপনার ভিক্ষান্নে দিনাতিপাত করে- আর তারপর আমাদের বাকি ‘সাধারণ মানুষ’ কে নাকের পোঁটার মতো মুছে ফেলে- কারণ আমরা তেমন শিক্ষিত নই! এই শেষের ব্যাপারটা দেখেই গা জ্বলে গেছে চাঁদ। জানতে চাইলে না?
এদেরই একাংশ দেশে ফিরে একসময় কলেজ-ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক হয়- ভুলে যাবেন না। তারা আবার কেমন করে চাকরি পায়, সে সব তো জানেন। কেমন পড়ায়, কেমন করে খাতা দেখে, সে সবও জানেন নিশ্চয়ই। কি আর করবেন, এদের তো গোড়াতেই গলদ! কোন পাতে খাচ্ছে, কোথায় গিয়ে ত্যাগ করছে, সেটা ভালো বুঝলে তো! সে যাক, এর পর থেকে কোন পূর্ণবয়স্ক জোয়ান ছেলে/মেয়ে কি করছে প্রশ্নের উত্তরে নাক আকাশের দিকে তুলে ‘রিসার্চ করছি’ বললে পালটা জিজ্ঞেস করবেন তো- ‘কেন? অন্য কোথাও পাও নি? আর করছো করো, কিন্তু এদ্দিন ধরে আমাদের টাকা যে ধ্বংস করছো, কবে কাজ করে সেটা ফেরত দেবে, সেটা জানিও চাঁদ/মামণি...’

Monday, September 16, 2013

'Chennai Express'ions... 1


চেন্নাইতে আসা এক মাস হয়ে গেল। থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা, কাছাকাছি বাজার-হাট দেখে নেওয়া, কাজ করার ঘর, টেবিল আর কম্পিউটার পাওয়া সবই মোটামুটি হয়ে গেছে, বাকি বলতে একটা সাইকেল জোগাড় করা আর প্রথম চেকটা ব্যাঙ্কে জমা দিয়ে আসা। দ্বিতীয়টা করতে গেলে প্রথমটা দরকার বলে দু’টোর কোনটাই করবো করবো করে আর করা হয়ে উঠছে না। তবু যাকে বলে সেট্‌ল্‌ করে গেছি। একটা নবীনবরণ গোছের অনুষ্ঠানও হয়ে গেছে। সোজা কথায় আমি এখন পাকাপোক্ত দক্ষিণ-ভারতের বাসিন্দা। কেমন আছি, কোথায় আছি, সেই নিয়ে নিয়মিত গল্প করবো বলেই লিখতে বসা। এর থেকে বেশি আর কোন মহৎ উদ্দেশ্য নেই।

রাতের শেষ প্রহরে ট্রেন থেকে নেমে কাজের জায়গায় আসতে গিয়েই পরিষ্কার বুঝলাম, কেন আসার আগে এত লোকে এত শোক পালন করছিল। সত্যি, শোক পালন! “যা, এবার সারাদিন কি করে দোসা-ইডলি খেয়ে কাটাস দেখি!” থেকে শুরু করে “আর যাওয়ার জায়গা পেলে না! ব্যাঙ্গালোর গেলেও বুঝতাম... চেন্নাই! খুব খাজা জায়গা ভাই, সত্যি বলছি” পর্যন্ত কত কিই না শুনলাম। যেন শখ করে জায়গা বেছেছি! ভারত সরকার কেন যে ট্যুরিস্ট-স্পটগুলোয় দেখে দেখে ইন্সটিটিউট বানায় না, হুঁহ্‌– যাক্‌, সে আর দুঃখ করে কি হবে। সব মিলিয়ে বেশ খানিকটা ভয় ছিলই, তার উপরে ভাষার অসুবিধে। ভাসা ভাসা জানা ছিল যে বহুদিন যাবৎ এখানে হিন্দির বিরুদ্ধে একরকম যুদ্ধ ঘোষণা হয়েছে – তাই কেউই ও ভাষায় কথা বলে না। জানলেও বলে না। সে ঠিক আছে। তাহলে বলেটা কি? নিশ্চয়ই ইংরেজি? তাহলেও তো অসুবিধে নেই- চালিয়ে নেবো। এইসব ভেবে দুগ্‌গা বলে বেরিয়ে পড়েছিলাম। পৌঁছে কি দেখলাম?

Thursday, March 28, 2013

আ মোলো বাংলাভাষা


যাদবপুর ৮বি বাসস্ট্যান্ড থেকে বাঘা যতীনের দিকে যেতে সুলেখা মোড় পেরিয়ে ডানদিকে একটা ‘ক্যাফে কফি ডে’র আউটলেট। বিকেলের দিকে প্রায় প্রতিদিনই ফাঁকা থাকে। স্বাভাবিক। অন্তত ইউনিভার্সিটির গড়পড়তা ছাত্র-ছাত্রীরা যে এখানে আসবে না, সেটা বলাই বাহুল্য। হাতখরচের টাকা বেশি খরচ করে খেতেই যদি হয়, তবে সামান্য দূরেই সাউথ সিটি আছে, বৈচিত্র্যের পসরা সাজিয়ে। এখানে আসে প্রধানত প্রেমী-যুগল – হয় ডাক্তারি, নয় ব্যবসার পিতৃদত্ত পয়সার মালিক, নয়তো নতুন প্রেমে পড়া মধ্যবিত্ত ছোকরা – ছোটবেলায় নচিকেতার ‘...মোটা মানিব্যাগ দেখে/ তোমাকে সাইডে রেখে/ দৌড়বে সোজা, সোজা দৌড়বে প্রেম...’ কথাটায় বেজায় ভয় পেয়ে তিনদিন টিফিন না খেয়ে জমানো টাকা উড়িয়ে মেয়েটিকে ইম্প্রেস করবে বলে, নয়তো মধ্যবয়স্কা নারীর দল – সমাজ বা প্যান্টালুন্‌স কিছু একটা উদ্ধার করে শরীর জুড়োতে আসা। এখানেই বসে গম্ভীর মুখে ল্যাপটপ খুলে দেশোদ্ধার করার ভান করছি। আসলে কিন্তু কান পড়ে আছে পাশের টেবিলে ট্যাঙ্ক-টপ আর হোঁৎকা বয়ফ্রেন্ডের অধিকারিণী চটকদার মেয়েটির কথার দিকে।

আজকের লেখার বিষয় এই কফিশপ-বিশ্বায়ন হতে পারতো – ‘আহা আমাদের কফি-হাউসের কি হবে গো!’ বলে চাড্ডি কান্নাকাটি করার সুযোগ থাকতো। দেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থা কি করে তরুণ সমাজের পকেটের গভীরতায় প্রতিফলিত হয়, সে নিয়ে পাঁচ পাতা প্যাঁচানো যেত। এমন কি ওই হোঁৎকা ছেলেটির ক্রমবর্ধমান মেদপুঞ্জ আসলে কিভাবে মুক্ত-বাণিজ্যের ষড়যন্ত্র আর ষড়রিপুর ফল, সে নিয়েও কিছু বিদ্যে ফলানো যেত – কিন্তু এ সব মাটি করল ওই মেয়েটা। 

প্রথমে খেয়াল করিনি। আধা-ইংরেজি, আধা হিন্দিতে বকবক শুনে ভেবেছিলাম

ধুয়ে দাও হে

সত্য বৃষ্টি ঝরে ছাতা, ক্ষেত, ভিক্টোরিয়ায় 
সত্য সূর্য ওঠে আকাশী চাঁদোয়া ঘেরা মাঠে
মিথ্যে সমস্তই চাঁদের আলোর মায়াময়
ভোর হলে ঘোর কাটে, গোলাপি নেশারা বাড়ি যায়

জ্ঞানীরা আয়না ভেবে পারা ঘষে ফেলে দেওয়া কাচে
কলেজ শিশুর মুখে শিক্ষিত চূন লেগে পরিধেয় হয় 
সুশিক্ষা ফুল হয়ে জীবনের বৌভাতে লাগে
ঘোলা, অগভীর মনে, কিছু কথা কই হয়ে বাঁচে।

এখনো পড়েনি খুলে সমস্ত প্রসাধন, সব ধারণা-
উলঙ্গ অনুভূতি, দপদপে ধিক্কার, শরীরের শাক-চাপা আছে
বেশ্যা গালিও দেয়, অথচ সহজে কথা বলে
ঘোলামন, প্রসাধন ফেলে দিতে আমরা পারি না?